মাস্কের টাকায় সত্যিই পৃথিবী কেনা সম্ভব? বিশ্বের সবাইকে ১৫ হাজার করে দিলেও শেষ হবে না ।


ইতিহাসের পাতায় নতুন নাম লিখলেন ইলন মাস্ক। রকেট কোম্পানি স্পেসএক্সের দুর্দান্ত সাফল্যের ওপর ভর করে তিনি এখন বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার, অর্থাৎ ১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যক্তিগত সম্পদের মালিক। একসময় যা ছিল কেবল কল্পনার অতীত, আজ তা বাস্তব। কিন্তু এক ট্রিলিয়ন ডলারের এই পাহাড়সম সম্পদ আসলে কতটা বিশাল ?



একটি সাধারণ হিসাবে, মাস্ক তার এই সম্পদ থেকে বিশ্বের ৮২০ কোটি মানুষের প্রত্যেককে ১৫ হাজার টাকা করেও যদি বিলিয়ে দেন, তবুও তার ভাণ্ডার শেষ হবে না। প্রশ্ন জাগে— একজন মানুষের হাতে থাকা এই অকল্পনীয় অর্থ কি তবে আস্ত একটা পৃথিবী কেনার মতো? চলুন, জেনে নেওয়া যাক ইলন মাস্কের এই ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের কিছু অবাক করা তথ্য...

ট্রিলিয়ন ডলার মানে হলো এক হাজার বিলিয়ন ডলার। ১ সংখ্যার পর ১২টি শূন্য বসালে হয় এক ট্রিলিয়ন। যাকে বাংলায় বলা যেতে পারে এক লাখ কোটি। বেশ কিছু সময় ধরে মাস্ক বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন, অথবা অন্তত সেই অবস্থানের কাছাকাছি ছিলেন। ফোর্বস-এর মতে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে অর্ধ-ট্রিলিয়ন ডলার (৫০০ বিলিয়ন) নিট সম্পদ অর্জন করেন।

এক মাস পরে, টেসলার শেয়ারহোল্ডাররা তার জন্য একটি রেকর্ড গড়া পারিশ্রমিক প্যাকেজ অনুমোদন করেন, যার সম্ভাব্য মূল্য এক ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের জুনে, তার রকেট নির্মাতা ও স্যাটেলাইট অপারেটর কোম্পানি স্পেসএক্স- যেটির মালিকানায় এক্স, গ্রক এবং স্টারলিংকও রয়েছে, সেটি পাবলিক হওয়ার পর মাস্কের নিট সম্পদ বিলিয়ন থেকে ট্রিলিয়ন পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

চাঁদে ২০০ বারের বেশি যাতায়াত

এক ট্রিলিয়ন ডলারের নোটগুলো যদি একটার পর একটা বিছিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা প্রায় ৯ কোটি ৭০ লক্ষ মাইল লম্বা হবে। এই দূরত্ব দিয়ে পৃথিবী থেকে চাঁদে ২০০ বারেরও বেশি আসা-যাওয়া করা সম্ভব। এমনকি এটি পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের চেয়েও বেশি।

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য ১২২ ডলার: বিশ্বের বর্তমান জনসংখ্যা ৮.২ বিলিয়ন। এই ১ ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষকে ১২২ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৫ হাজার ৪ টাকা) করে দেয়া সম্ভব।

দেশ ও অর্থনীতির চেয়েও বড়

মাস্কের জন্মভূমি দক্ষিণ আফ্রিকার বার্ষিক জিডিপি-এর দ্বিগুণেরও বেশি এই ১ ট্রিলিয়ন ডলার। বর্তমানে বিশ্বের মাত্র ২১টি দেশের জিডিপি ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। এমনকি মাস্কের স্পেসএক্স কোম্পানির বাজার মূল্য অনেক দেশের অর্থনীতির চেয়েও বেশি।

বিশাল আবাসন ও জ্বালানি সক্ষমতা

যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়া বাড়িগুলোর গড় দাম অনুযায়ী, এই টাকা দিয়ে প্রায় ২৫ লক্ষ বাড়ি কেনা সম্ভব। জ্বালানির বাজারে দেখলে, এই অর্থ দিয়ে ২৪,৩০০ কোটি গ্যালন পেট্রোল কেনা যাবে, যা গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মোট পেট্রোল ব্যবহারের চেয়েও অনেক বেশি।

বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তুলনায় মাস্ক

মাস্কের এই সম্পদ যে কতটা পাহাড়সম, তা বোঝা যায় অন্যদের সাথে তুলনায়। বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী গুগলের ল্যারি পেজের সম্পদের চেয়ে মাস্ক প্রায় ৭০,০০০ কোটি ডলার এগিয়ে আছেন। এমনকি ফোর্বসের তালিকার মাস্কের পরবর্তী চার ধনী ব্যক্তির সম্মিলিত সম্পদের চেয়েও মাস্কের সম্পদ বেশি।

ইলন মাস্কের জন্ম কোথায়

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্ম নেওয়া এলন মাস্ক ছোটবেলা থেকেই ছিলেন দারুণ উদ্যমী। শৈশবেই তিনি ব্যবসায়িক দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিলেন—ভাইয়ের সঙ্গে মিলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিজের হাতে বানানো চকোলেট ইস্টার ডিম বিক্রি করতেন। শুধু তাই নয়, মাত্র ১২ বছর বয়সেই তিনি তৈরি করেছিলেন তার প্রথম কম্পিউটার গেম।

তবে তার শৈশব মোটেও সহজ ছিল না। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, স্কুলে সহপাঠীদের হয়রানি (বুলিং) এবং অ্যাসপারগার সিনড্রোমের কারণে সামাজিক মেলামেশায় তাকে বেশ প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কঠিন এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। তাই সুযোগ পাওয়ামাত্রই পড়াশোনার অজুহাতে পাড়ি জমান নিজের বাড়ি থেকে অনেক দূরে। প্রথমে কানাডা এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ভর্তি হন পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তিনি অর্থনীতি ও পদার্থবিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করেন।

সম্পদ তৈরি করলেন কীভাবে

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মাস্ক পড়াশোনা ছেড়ে ব্যবসায় মন দেন। নব্বইয়ের দশকে তিনি দুটি প্রযুক্তি স্টার্ট-আপ গড়ে তোলেন। এর মধ্যে একটি ছিল অনলাইন ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান, যা পরবর্তীতে ‘পেপ্যাল’-এ রূপ নেয়। ২০০২ সালে এটি ই-বে’র কাছে ১.৫ বিলিয়ন ডলারে বিক্রি করেন তিনি।

সেই টাকা তিনি বিনিয়োগ করেন স্পেসএক্স এবং টেসলায়। স্পেসএক্সের লক্ষ্য ছিল নাসার চেয়ে কম খরচে রকেট তৈরি করা, আর টেসলাতে ২০০৮ সালে তিনি প্রধান নির্বাহী হিসেবে যোগ দেন। আর্থিক সংকটের নানা বাধা পেরিয়ে এই দুই কোম্পানিই আজ বিশ্বজুড়ে শিল্প বিপ্লব ঘটিয়েছে।

২০২২ সালের অক্টোবরে মাস্ক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে টুইটার কিনে নেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য ৯.৪ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে বলে ধারণা করা হয়। তার লক্ষ্য ছিল একে সবকিছুর অ্যাপ হিসেবে গড়ে তোলা। তবে মাস্কের নেতৃত্বের অধীনে প্ল্যাটফর্মটিতে ঘৃণামূলক বক্তব্য বাড়ার অভিযোগে অনেক প্রতিষ্ঠান এখান থেকে সরে গেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর জগতেও তিনি বেশ সক্রিয়। ওপেনএআই-এর প্রাথমিক বিনিয়োগকারী হলেও পরে তিনি আলাদা হয়ে যান এবং ২০২৩ সালে 'এক্সএআই' প্রতিষ্ঠা করেন। ওপেনএআই ও এর প্রধান স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে করা তার একটি মামলা ২০২৬ সালের মে মাসে আদালত খারিজ করে দেয়।

ইলন মাস্কের সন্তান কতজন

ইলন মাস্কের ১৪ সন্তান রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম স্ত্রীর গর্ভে ছয় জন, কানাডিয় সংগীতশিল্পী ক্লেয়ার এলিস বুশে বা গ্রাইমসের সঙ্গে তিন সন্তান, নিউরোলিংক নির্বাহী শিভন জিলিসের সঙ্গে চার সন্তান এবং ইনফ্লুয়েন্সার অ্যাশলি সেইন্ট ক্লেয়ারের থেকে এক সন্তান। জিলিসের সঙ্গে যমজ সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর তিনি লিখেছিলেন, জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলায় আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।

অন্যদিকে সেইন্ট ক্লেয়ার, যিনি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সন্তানের জন্মের কথা জানান, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মাস্কের কোম্পানি এক্সএআই-এর বিরুদ্ধে মামলা করেন, অভিযোগ করেন যে গ্রক ব্যবহার করে তার যৌনতাযুক্ত ডিপফেক তৈরি করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, মাস্কের এই আকাশছোঁয়া সম্পদ বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে যখন ধনকুবেরদের সম্পদের পাহাড় বাড়ছে, অন্যদিকে বিশ্বের সাধারণ মানুষ নিত্যদিনের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। মাস্কের এই ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার ঘটনা তাই সম্পদ বৈষম্যের এক চরম ও উদ্বেগজনক উদাহরণ হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।

Post a Comment

Previous Post Next Post